Aparna-Anjan: খাদের ধারের রেলিংটায় আটকে জীবন, দাম্পত্য-সখ্যের 'পরম' কথকতায় নরম আলো...

Aparna-Anjan: একাকিত্বের গল্প বলে সবাই। অনেকেই বলে সম্পর্কের টানাপোড়েনের গল্পও। সোশ্যাল মিডিয়ায় হাট হয়ে যাওয়া দৈনন্দিনতায় কখনও জ্বলে উ‍‌ত্‍সবের নিয়নবাতি, কখনও হেমন্তের বিষণ্ণ কুয়াশা। মানুষ হাত ধরতে চায়, হাত ছাড়তে চায়ও। বয়স বাড়ে, রাত গাঢ় হয়। আর পরম যত্ন করে বোনেন সেই গল্প। অপর্ণা-অঞ্জন যেখানে জীবনের ব্যালে নাচেন, ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজে এই রাত তোমার আমার।

Updated By: Feb 13, 2025, 08:27 PM IST
Aparna-Anjan: খাদের ধারের রেলিংটায় আটকে জীবন, দাম্পত্য-সখ্যের 'পরম' কথকতায় নরম আলো...

নবনীতা সরকার: 'হাতের উপর হাত রাখা খুব সহজ নয়
                                              সারা জীবন বইতে পারা সহজ নয়...'

শঙ্খ ঘোষের এই অমোঘ কবিতা বিপুল জনপ্রিয়। সম্পর্কের ছায়াছবি দেখতে বসলে, এই ভাঙনের যুগেও টিকে যাওয়া আর থেকে যাওয়া সম্পর্কগুলো মনে অনুরণন তোলে। বাংলায় এর আগে দাম্পত্যের ছবি হয়েছে। কিন্তু পরমব্রত চট্টোপাধ্যায় (Parambrata Chattopadhyay)পরিচালিত 'এই রাত তোমার আমার' দর্শকের মনে মুগ্ধতা ছাডাও কিছু প্রশ্ন রেখে গেল। 

আরও পড়ুন: Rapper Abhinav: জনপ্রিয় র‍্যাপারের রহস্যমৃত্যু! অ্যাপার্টমেন্টেই মিলল দেহ, কাঠগড়ায় স্ত্রী...

অভ্যাস নাকি ভালোবাসা? সম্পর্কে কোনটা থাকে? কীসের তাড়নায় একসঙ্গে থেকে যায় ৫০টি বসন্ত একসঙ্গে পার করা সত্তরোর্ধ্ব দম্পতি? এই জটিল প্রশ্নের আবর্তে ঘোরে পুরো সিনেমা। ক্যান্সার আক্রান্ত সদ্য কেমোথেরাপি শেষ করা বৃদ্ধার চরিত্রে অপর্ণা সেনের (Aparna Sen) অভিনয় নিয়ে নতুন করে কিছু বলার থাকে না। স্বমহিমায় উজ্জ্বল। ছেলে জয়, স্ত্রী-সন্তান নিয়ে অন্যত্র থাকে। চাবাগানের মালিক বৃদ্ধ বাবা অঞ্জন দত্তর সঙ্গে তীব্র মতবিরোধে প্রায় পনেরো বছর কথা বন্ধ ছেলে পরমব্রতর। এই সিনেমা দেখতে দেখতে নগর জীবনের বহু ঘটনা মনে পড়ে যায় যেখানে বৃদ্ধ মা-বাবাকে শেষ বয়সে আশ্রয় নিতে হয় বৃদ্ধাশ্রমে অথবা শেষ জীবনে দুজন দুজনের পরিপূরক হয়ে ওঠে।শহর বা শহরতলিতে ঘটতে থাকা বৃদ্ধ দম্পতির শেষ বয়সে মরণঝাঁপ, সন্তানসন্ততির সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে মতবিরোধ, অশীতিপর বৃদ্ধর হাত থেকে ফস্কে খাবারের বাটি পড়ে যাওয়া এবং তার মধ্যেই পা পিছলে পড়ে যাওয়ার মতো খুব সাধারণ অথচ প্রাসঙ্গিক কিছু বিষয় যেন দর্শককে ভাবাবে আরেকবার। দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরের দাম্পত্যে সম্পর্কের টানাপোড়েন জীবনের অংশ। কখনও সুতো আলগা হয় আবার কালের নিয়মে তা জোড়াও লেগে যায়। আমাদের আশপাশে ঘটে চলা এইরকমই ঘটনা প্রবাহকে নরম আলো ও স্নিগ্ধ সংগীতের মোড়কে বুনেছেন পরিচালক।

আরও পড়ুন:  Rachna Banerjee: প্রয়াগে যোগীর ব্যবস্থাপনায় মুগ্ধ রচনা! এবার ত্রিবেণী কুম্ভে মাথায় জল ছিটিয়ে বললেন...

অঞ্জন দত্তকে (Anjan Dutta) ওল্ড ওয়াইন মনে হয় আজকাল। যত বয়স বাড়ছে অভিনয়ের ধার প্রখরতর হচ্ছে। জাত অভিনেতাদের বোধহয় এই হয়। ওর অভিনয়ের জোরই শেষ পর্যন্ত টেনে রাখবে দর্শকদের। থিয়েটারের অঞ্জনের থেকে ছবির অঞ্জন যেন একদম আলাদা। সীমিত,স্থির, সূক্ষ্ম-- যিনি নিজেই অভিনয়ের একটি প্রতিষ্ঠান। ঝড়-জল, ধস নেমে রাস্তা বন্ধ হয়ে যাওয়া, বিদ্যুৎহীন এক রাতের গল্পই মূল উপজীব্য এই ছবির। বিয়ের পঞ্চাশতম বিবাহবার্ষিকীর রাতে একাকী বৃদ্ধ দম্পতির একে অপরের কাছে চমকপ্রদ স্বীকারোক্তিই যেন এই ছবির ক্লাইম্যাক্স। শেষ দৃশ্যে ক্যান্সার আক্রান্ত স্ত্রী মারা যাওয়ার পরও বৃদ্ধ ভদ্রলোক জীবনবিমুখ হয়ে যাননি, বরং আরও বেশি করে জীবনে ফেরার ইচ্ছেয়,সম্পর্কের তাগিদে নিজের ছেলেকে ফোন করে কেঁদে ফেলে। তাঁর মন আবার একসঙ্গে থাকতে চায় ছেলের সঙ্গে। এই ঘটনা চলমান জীবনে দর্শককে বারবার ধাক্কা দেবে মননে, চিন্তায়। দর্শক আরেকবার পর্দার সঙ্গে মেলাতে পারবেন তাঁদের জীবনকে।           

পরমব্রতর সেরা পরিচালনা সম্ভবত এখনও অবধি এটিই। দার্জিলিঙের এক ডুপ্লেক্স বাংলো বাড়িতে পুরো ছবি দাঁড়িয়ে যেখানে সাধারণ মধ্যবিত্ত অনুভূতি বা বৃদ্ধ বয়সের নানান শারীরিক সমস্যায় জর্জরিত দম্পতি তাঁদের উদযাপনের মুহূর্তে ফিরে যায় অতীতের এক ঘটনায় যা প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায় তাদের দাম্পত্য জীবনকে। সম্পর্কের ভাঙন নয় বরং আরও বেঁধে বেঁধে থাকার মন্ত্রই শেষ পর্যন্ত বলে যাবে এই ছবি। ইন্দ্রদীপ দাশগুপ্ত এই ছবির সংগীতের দায়িত্বে থেকে অঞ্জন দত্তর গলায় রবীন্দ্রসংগীত উপহার দিয়েছেন দর্শকদের।

সংলাপ নির্ভর ধীর ছবি দর্শকের অনেক সময় বোর লাগে কিন্তু এ ছবি তা নয়। বরং অতি সন্তর্পণে আঁকা হয়েছে জীবনের সংলাপ।   ক্যামেরা, সম্পাদনা, আলো প্রতিটি বিভাগ পরিমিত ও সুন্দর।

ছবির নামে 'এই রাত' থাকলেও দর্শকের প্রত্যাশা পরিচালকের কাছে যে এমন চমৎকার রাত আরও অনেক আসুক এরকম ছবি নিয়ে। কিছুদিন আগেই খাদান বক্স অফিসে তুমুল সাফল্য এনেছে। 'সত্যি বলে সত্যি কিছু নেই', 'সন্তান' এবং অন্য ধারার ছবি 'চালচিত্র'ও দর্শক-প্রশংসিত। তাই বলা যেতেই পারে বাংলা সিনেমার সুদিন এসেছে। 'এই রাত তোমার আমার' এর হাত ধরে বাংলা সিনেমা আরও বলিষ্ঠ হল। রুচি ফিরে এল জিভে।ছবির নামে 'এই রাত' থাকলেও দর্শকের প্রত্যাশা পরিচালকের কাছে যে, এমন চমৎকার রাত আরও অনেক আসুক এরকম ছবি নিয়ে।

 

(দেশ, দুনিয়া, রাজ্য, কলকাতা, বিনোদন, খেলা, লাইফস্টাইল স্বাস্থ্য, প্রযুক্তির টাটকা খবর, আপডেট এবং ভিডিয়ো পেতে ডাউনলোড-লাইক-ফলো-সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের AppFacebookWhatsapp ChannelX (Twitter)YoutubeInstagram পেজ-চ্যানেল) 

 

 

.